মহাকাশের রহস্য: নক্ষত্র গণনা থেকে লাদাখের রক্তিম আকাশ ও সৌরঝড়ের সতর্কতা

অমানিশার রাতে আকাশের দিকে তাকালে মনে হয় অগণিত তারা জ্বলছে। ঘন নীল ক্যানভাসে ছোট-বড় তারার মিটমিট করা দেখে মনে হতে পারে সংখ্যায় এরা লক্ষাধিক, যা গুনে শেষ করা অসম্ভব। কিন্তু এই ধারণা পুরোপুরি সঠিক নয়। মহাকাশবিজ্ঞানীরা বহু আগেই খালি চোখে দৃশ্যমান তারার হিসাব কষেছেন, যার সংখ্যা একটি গোলার্ধে মাত্র হাজার তিনেকের মতো। তবে সেই শান্ত আকাশের দৃশ্যপট ইদানীং পাল্টাচ্ছে, যার প্রমাণ মিলল সম্প্রতি ভারতের লাদাখে। একদিকে যেমন নক্ষত্র চেনার আদি ইতিহাস আমাদের মুগ্ধ করে, অন্যদিকে সূর্যের সাম্প্রতিক আচরণ পৃথিবীবাসীর জন্য এক নতুন সতর্কবার্তা নিয়ে এসেছে।

নক্ষত্র মানচিত্রের ইতিহাস ও বিবর্তন

আকাশের তারাদের নিয়ে মানুষের কৌতূহল আজকের নয়। খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতকে চিনের প্রখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী শি শেন প্রথম তারার তালিকা তৈরি করেন। পরবর্তীতে গ্রিক বিজ্ঞানী হিপার্কাস উজ্জ্বল তারাগুলোর অবস্থান নির্ণয় করে একটি স্বতন্ত্র তালিকা প্রস্তুত করেন, যা তৎকালীন সময়ে এক অসামান্য কীর্তি হিসেবে গণ্য হতো। সেই যুগে টেলিস্কোপ ছিল না, কেবল খালি চোখ আর সাধারণ যন্ত্রপাতির ওপর নির্ভর করেই আকাশের মানচিত্র আঁকা হতো।

এর বহু পরে, পনেরো শতকে সমরখন্দের শাসক ও বিজ্ঞানী উলুগ বেগ এক বিশাল মানমন্দির তৈরি করেন, যেখানে একশোর বেশি বিজ্ঞানী মিলে নক্ষত্র জগত নিয়ে গবেষণা করতেন। তবে আসল বিপ্লব আসে গ্যালিলিওর হাত ধরে। তিনি যখন তাঁর সাধারণ টেলিস্কোপটি আকাশের সেই অংশের দিকে ঘোরালেন যেখানে খালি চোখে মাত্র তিনটি তারা দেখা যেত, সেখানে তিনি কুড়িটি তারা দেখতে পেলেন।

প্রযুক্তির চোখ: ফটোগ্রাফির কামাল

এরপর যুক্ত হল ফটোগ্রাফি বা আলোকচিত্রের প্রযুক্তি। মানুষের চোখের একটি সীমাবদ্ধতা হল, আমরা দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থাকলেও খুব ক্ষীণ আলো দেখতে পাই না। কিন্তু ফটোগ্রাফিক ফিল্ম বা প্লেট সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আলো জমা করতে পারে। প্রাচীনকালে শাস্তিস্বরূপ মানুষের শরীরে ফোঁটা ফোঁটা জল ফেলার একটি প্রথা ছিল। প্রথম কয়েক ফোঁটায় কিছু মনে না হলেও, দীর্ঘক্ষণ একই স্থানে জল পড়লে পাথরও ক্ষয়ে যায়। ফটোগ্রাফিক প্লেটে আলোর প্রতিক্রিয়া অনেকটা সেরকমই। ঘণ্টার পর ঘণ্টা এক্সপোজারে রাখলে অদৃশ্যপ্রায় তারার ছবিও প্লেটে ফুটে ওঠে, যা মানুষের খালি চোখ বা সাধারণ টেলিস্কোপে ধরা পড়ে না।

লাদাখের আকাশে রক্তের আভা: বিপদের ইঙ্গিত?

আমরা যখন দূরের নক্ষত্র পর্যবেক্ষণে ব্যস্ত, ঠিক তখনই আমাদের সবথেকে কাছের নক্ষত্র—সূর্য—তার রুদ্ররূপ দেখাচ্ছে। গত ১৯ ও ২০ জানুয়ারি লাদাখের হানলে অঞ্চলের আকাশ হঠাৎ করেই এক ভৌতিক লাল আলোয় ছেয়ে যায়। এই বিরল মহাজাগতিক ঘটনাটি নিছক কোনও সৌন্দর্য ছিল না, বরং এটি ছিল একটি শক্তিশালী সৌরঝড় বা জিওম্যাগনেটিক স্টর্মের ফলাফল।

বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘অরোরা’ বা মেরুজ্যোতি। সাধারণত মেরু অঞ্চলে দেখা গেলেও, এবার তীব্র সৌর বিস্ফোরণের কারণে এটি লাদাখের মতো জায়গাতেও দৃশ্যমান হয়েছে। ১৮ জানুয়ারি সূর্য থেকে একটি শক্তিশালী এক্স-ক্লাস ফ্লেয়ার বা বিস্ফোরণ ঘটে, যা সেকেন্ডে প্রায় ১৭০০ কিলোমিটার বেগে পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসে। এটি জি-৪ মাত্রার একটি ভূ-চৌম্বকীয় ঝড়ের সৃষ্টি করে।

লাল রঙের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা

হানলের আকাশে এই লাল রঙের খেলার পেছনে রয়েছে বিজ্ঞান। সূর্য থেকে আসা আহিত কণা বা প্লাজমা যখন পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে আঘাত করে, তখন বাতাসের অণুগুলোর সঙ্গে সংঘর্ষে আলো নির্গত হয়। এই সংঘর্ষ যদি বায়ুমণ্ডলের অনেক উঁচুতে—প্রায় ৩০০ কিলোমিটার উচ্চতায়—ঘটে, যেখানে বাতাস খুব পাতলা, তখন অক্সিজেনের অণুগুলো উত্তেজিত হয়ে লাল আলো বিকিরণ করে।

ঘন বায়ুমণ্ডলে কণাগুলো দ্রুত শক্তি হারিয়ে ফেলে, কিন্তু উঁচুতে বাতাসের ঘনত্ব কম থাকায় অক্সিজেন পরমাণুগুলো দীর্ঘ সময় ধরে শক্তি ধরে রাখতে পারে এবং ৬৩০ ন্যানোমিটার তরঙ্গদৈর্ঘ্যের লাল আলো ছড়ায়। লাদাখের আকাশে আমরা ঠিক এই দৃশ্যই দেখেছি।

সৌরচক্র ২৫ ও প্রযুক্তিগত ঝুঁকি

লাদাখের এই ঘটনাকে বিজ্ঞানীরা সূর্যের চরম অস্থিরতার প্রারম্ভিক সংকেত হিসেবে দেখছেন। সূর্য বর্তমানে তার ১১ বছরের চক্রের ‘সোলার সাইকেল ২৫’-এর মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। নাসা যেমনটা ধারণা করেছিল, সূর্য তার চেয়েও অনেক বেশি আগ্রাসী আচরণ করছে এখন। আমরা ‘সোলার ম্যাক্সিমাম’-এর দিকে এগিয়ে যাচ্ছি, যখন সূর্যের চৌম্বক ক্ষেত্র উল্টে যায় এবং ঘন ঘন সৌর বিস্ফোরণ ঘটে।

বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগের মূল কারণ তাপ নয়, বরং তড়িৎচৌম্বকীয় প্রভাব। সূর্যের এই বর্ধিত কার্যকলাপের ফলে ভবিষ্যতে ‘ক্যারিংটন ইভেন্ট’-এর মতো ভয়াবহ সৌরঝড় আঘাত হানার আশঙ্কা বাড়ছে। যদি আজ এমন কোনও শক্তিশালী ঝড় পৃথিবীকে আঘাত করে, তবে তা বিশ্বজুড়ে স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক অচল করে দিতে পারে। এমনকি শক্তিশালী বৈদ্যুতিক প্রবাহের ফলে পাওয়ার গ্রিড এবং ট্রান্সফর্মার গলে গিয়ে বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।