মহাজাগতিক ধ্বংস ও সৃষ্টির খতিয়ান: পৃথিবীর সুরক্ষায় পরমাণু-ছক এবং জেমস ওয়েবের লেন্সে নক্ষত্র-কারখানা

বিশাল মহাকাশ যেমন অনন্ত বিস্ময়ের আধার, তেমনই তা ভয়ানক সব বিপদেরও উৎস। পৃথিবীর দিকে তীব্র গতিতে ধেয়ে আসা কোনও রাক্ষুসে গ্রহাণু মানবসভ্যতার জন্য সবচেয়ে বড় আতঙ্কের কারণ হতে পারে। বিজ্ঞানীরা অনেক দিন ধরেই একমত যে, এমন কোনও মহাজাগতিক বিপদের হদিস পেলে তাকে আগেভাগেই ধ্বংস করা উচিত। কিন্তু সেই ধ্বংসের পদ্ধতি কী হবে, তা নিয়ে বিস্তর মতপার্থক্য রয়েছে। মহাশূন্য ভেদ করে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ধেয়ে আসা বিশাল পাথরখণ্ডকে আঘাত করলে তার পরিণতি কী হবে, ধ্বংসাবশেষ পৃথিবীর দিকে ছিটকে এসে আরও বড় বিপর্যয় ঘটাবে কি না, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের চিন্তার অন্ত নেই। তবে দীর্ঘ গবেষণার পর এই সম্ভাব্য ললাটলিখন ঠেকানোর একটি উপায় হিসেবে পরমাণু বিস্ফোরণের তত্ত্বটি জোরালো হচ্ছে।

পরমাণু আঘাত কতটা কার্যকর

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল পদার্থবিদ একটি বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে যৌথ ভাবে মহাজাগতিক পাথরখণ্ডের চরিত্র নিয়ে গবেষণা করেছেন। নির্দিষ্ট দূরত্ব থেকে ধেয়ে আসা গ্রহাণুর উপর পারমাণবিক আঘাত হানলে তা কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীদের একাংশ। গবেষণাদলের অন্যতম সদস্য মেলানি বোচম্যান জানিয়েছেন, তেজস্ক্রিয় বিকিরণের প্রভাবে উল্কাপিণ্ডের অভ্যন্তরীণ কাঠামো কতটা বদলায়, সেটাই ছিল তাঁদের মূল অন্বেষণ। বিশ্লেষণে এক চমকপ্রদ তথ্য উঠে এসেছে। এত দিন বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, গ্রহাণু হয়তো সহজেই ভেঙে ফেলা সম্ভব। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, এই মহাজাগতিক পাথরখণ্ডগুলি কল্পনার চেয়ে অনেক বেশি চাপ ও ধাক্কা সহ্য করতে পারে। তীব্র আঘাত পেলেই যে তারা চূর্ণবিচূর্ণ বা বিচলিত হয়ে যাবে এমন নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে তারা আরও শক্তিশালী এবং জমাটবদ্ধ হয়ে ওঠে। তাই গ্রহাণু ধ্বংস করতে হলে আঘাতটি হতে হবে অত্যন্ত নিখুঁত হিসাব কষে, যাতে পাল্টা কোনও প্রতিক্রিয়া বা পৃথিবীর বিন্দুমাত্র ক্ষতি না হয়।

সৃষ্টির সন্ধানে নজরদারি

একদিকে বিজ্ঞানীরা যখন মহাজাগতিক ধ্বংসলীলা ঠেকানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন, ঠিক তখনই জ্যোতির্বিজ্ঞানের অন্য একটি শাখা মহাবিশ্বের সৃষ্টির আদিলগ্নকে বোঝার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। পৃথিবীর সুরক্ষার পাশাপাশি মহাকাশের এই অনন্ত রহস্য উন্মোচনে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হয়ে উঠেছে জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ। পৃথিবী থেকে প্রায় 17,000 আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত ওয়েস্টারহাউট 51 (Westerhout 51) এমনই এক বিশাল ‘নক্ষত্র কারখানা’, যার দিকে সম্প্রতি জেমস ওয়েব তার লেন্স তাক করেছিল। প্রায় 350 আলোকবর্ষ জুড়ে বিস্তৃত এই অঞ্চলে রয়েছে অসংখ্য অত্যন্ত বিরল ‘ও’ (O) শ্রেণির নক্ষত্র। এই বিশালাকার নীলচে নক্ষত্রগুলি প্রচণ্ড উত্তপ্ত এবং উজ্জ্বল, যাদের পৃষ্ঠের তাপমাত্রা 30,000 কেলভিনেরও বেশি।

ধুলোর চাদর সরিয়ে নতুন আবিষ্কার

এই দৈত্যাকার নক্ষত্রগুলি তাদের চারপাশের বিপুল পরিমাণ আণবিক গ্যাসের সঙ্গে ঠিক কী ভাবে প্রতিক্রিয়া ঘটায়, তা জানাই ছিল বিজ্ঞানীদের মূল লক্ষ্য। ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাইল বাম্পারস জানিয়েছেন, এর আগে তোলা ছবিগুলির রেজোলিউশন ও সংবেদনশীলতা খুব কম ছিল। নক্ষত্রগুলি তাদের জন্মস্থানের ঘন ধুলোর আস্তরণে ঢাকা থাকায় সাধারণ টেলিস্কোপে সেভাবে কিছুই ধরা পড়ত না। কিন্তু জেমস ওয়েবের নিয়ারক্যাম (NIRCam) এবং মিরি (MIRI) যন্ত্রের সাহায্যে তোলা ‘দ্য অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল জার্নাল’-এ প্রকাশিত ছবিগুলি এক অভাবনীয় দৃশ্য তুলে ধরেছে। এই নতুন ছবিগুলিতে প্রোটোস্টেলার জেট থেকে তৈরি হওয়া বিশাল সব তরঙ্গ, সদ্যোজাত নক্ষত্র, দৈত্যাকার বুদবুদ এবং অন্ধকার গ্যাসীয় সুতোর মতো গঠন অত্যন্ত স্পষ্ট ভাবে ধরা পড়েছে।

গ্যাসীয় মেঘ ও নক্ষত্রস্তবকের দ্বৈরথ

গবেষণায় বেশ কিছু আনকোরা তথ্য বিজ্ঞানীদের অবাক করেছে। হাই-রেজোলিউশনের ছবিগুলি ডব্লিউ51-ই (W51-E) এবং ডব্লিউ51-আইআরএস2 (W51-IRS2) নামের দু’টি বিশালাকার প্রোটোক্লাস্টারের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য তুলে ধরেছে। দেখা যাচ্ছে, ডব্লিউ51-ই ক্লাস্টারে এখনও চারপাশ থেকে প্রবল বেগে গ্যাস এসে জমা হচ্ছে। অন্যদিকে ডব্লিউ51-আইআরএস2-এর চারপাশে একটি বড় শূন্যস্থান বা গহ্বর তৈরি হয়েছে, যা প্রমাণ করে যে এই ক্লাস্টারের প্রবল শক্তি সেখানে নতুন করে গ্যাস প্রবেশের পথ বন্ধ করে দিয়েছে।

জেমস ওয়েব এবং রেডিয়ো টেলিস্কোপ আলমা (ALMA)-র তথ্যের তুলনা করে দেখা গিয়েছে, মাত্র 10% উৎসের ক্ষেত্রেই উভয়ের তথ্যে মিল রয়েছে। বাকি উৎসগুলি এতই শীতল বা ধুলোর এত গভীরে লুকিয়ে আছে যে তা জেমস ওয়েবের অত্যাধুনিক লেন্সেও অধরা রয়ে গিয়েছে। পাশাপাশি, ডব্লিউ51-আইআরএস2-এর উত্তরে আয়োনাইজড লোহা এবং হাইড্রোজেন গ্যাসের এক অদ্ভুত উজ্জ্বল ও জমাট পিণ্ডের সন্ধান মিলেছে, যা আসলে একটি বিশাল নক্ষত্র থেকে নির্গত প্রোটোস্টেলার জেটের সঙ্গে ঘন আন্তঃনাক্ষত্রিক মাধ্যমের ভয়ানক সংঘর্ষের ফল। এই আবিষ্কারগুলি আমাদের গ্যালাক্সির অন্যতম সক্রিয় নক্ষত্র গঠনকারী অঞ্চল সম্পর্কে পুরনো ধারণাকে ভেঙে দিয়ে নতুন রহস্যের জন্ম দিয়েছে, যা নিয়ে আগামী দিনে আরও গবেষণার প্রয়োজন।