শিক্ষাক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগান্তকারী প্রভাব: চীনের জাতীয় নীতি থেকে বিমটেক-এর বৈশ্বিক সাফল্য

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এখন আর কেবল প্রযুক্তিগত ধারণার গণ্ডিতে আটকে নেই। এশিয়ার সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থায় এটি একটি বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তনের নেতৃত্ব দিচ্ছে। একদিকে চীন তাদের সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থায় এআই যুক্ত করার জন্য বিশাল জাতীয় পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে, অন্যদিকে ভারতের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এর ব্যবহারিক প্রয়োগ ঘটিয়ে বিশ্বমঞ্চে স্বীকৃতি আদায় করে নিচ্ছে।

চীনের ব্যাপক কাঠামোগত পরিবর্তন

চীনের শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছে যে, শিক্ষকদের যোগ্যতা নির্ধারণী পরীক্ষা এবং সার্টিফিকেশনের ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অন্তর্ভুক্ত করা হবে। ২০৩০ সালের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘এআই শিক্ষাব্যবস্থা’ গড়ে তোলার যে বৃহত্তর লক্ষ্যমাত্রা দেশটির রয়েছে, এটি তারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই কাঠামোর অধীনে সমাজের বৃহত্তর স্তরেও এআই শিক্ষাকে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

সরকারি কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী, ক্লাস শুরুর আগের প্রস্তুতি থেকে শুরু করে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান এবং ক্লাস-পরবর্তী মূল্যায়ন—সব ক্ষেত্রেই এআই-এর ব্যবহার থাকবে। মূলত শিক্ষকদের কাজের চাপ কমানো এবং কর্মদক্ষতা বাড়ানোই এর প্রধান লক্ষ্য। স্মার্ট টিচিং সিস্টেমগুলো অ্যাসাইনমেন্ট পরিচালনা, স্বয়ংক্রিয় গ্রেডিং এবং শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার ক্ষেত্রে সাহায্য করবে। এমনকি শিক্ষকদের পড়ানোর ধরন বিশ্লেষণ করে শিক্ষার সামগ্রিক মান বাড়াতেও এআই টুলস ব্যবহার করা হবে।

প্রাথমিক থেকে উচ্চ বিদ্যালয় স্তরে পর্যাপ্ত এবং সুপরিকল্পিত কোর্সের মাধ্যমে এআই শিক্ষার প্রসার ঘটানো হচ্ছে। প্রতিটি স্তরে শেখার উদ্দেশ্য, বিষয়বস্তু এবং ক্লাসের সময় নির্ধারণ করে এআই-কে স্থানীয় পাঠ্যক্রমের সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে যুক্ত করা হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এটি একটি সাধারণ ভিত্তিগত কোর্স হিসেবে পড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন প্রযুক্তি, শিল্প ও ব্যবসায়িক মডেলের দিকে নজর রেখে অ্যাকাডেমিক প্রোগ্রামগুলোতেও পরিবর্তন আনবে তারা। সব ডিসিপ্লিনের শিক্ষার্থীরা যাতে এআই সম্পর্কে প্রাথমিক জ্ঞান লাভ করতে পারে, তার জন্য তৈরি করা হচ্ছে নির্দিষ্ট পাঠ্য উপকরণ।

বাস্তব প্রয়োগে ভারতের দৃষ্টান্ত

চীন যখন জাতীয় স্তরে নীতি নির্ধারণ করছে, তখন ভারতের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এআই-এর বাস্তব প্রয়োগে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড তৈরি করছে। এর একটি বড় উদাহরণ হলো বিড়লা ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট টেকনোলজি বা বিমটেক। প্রতিষ্ঠানটির ডিরেক্টর ড. প্রবীণা রাজীব ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উপযোগী এমন একটি শিক্ষাঙ্গনের রূপরেখা তুলে ধরেছেন, যেখানে বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা, শিল্পের চাহিদা এবং উদ্ভাবনের মেলবন্ধন ঘটেছে।

‘টিচিং অ্যান্ড লার্নিং এক্সিলেন্স’ বিভাগে বিমটেক সম্প্রতি ‘২০২৬ এএসিএসবি গ্লোবাল ইমপ্যাক্ট অ্যাওয়ার্ড’ অর্জন করেছে। তাদের ‘এআই-এনেবলড ইন্টারভিউ মাস্টারি’ উদ্যোগের জন্যই এই বিশ্বজোড়া সম্মাননা। ড. রাজীব জানান, বিজনেস কমিউনিকেশন পাঠ্যক্রমের অংশ হিসেবে তারা এই এআই-চালিত ইন্টারভিউ মডিউলটি ব্যবহার করছেন। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা কর্পোরেট ইন্টারভিউয়ের একেবারে বাস্তবমুখী একটি সিমুলেশনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়।

প্রযুক্তি ও মানবিক নির্দেশনার মেলবন্ধন

পুরো প্রক্রিয়াটি শুধু যন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিক্ষার্থীদের যোগাযোগ দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস এবং প্রেজেন্টেশনের ওপর ডেটা-ভিত্তিক তাৎক্ষণিক ফিডব্যাক দেয়। তবে এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকে অভিজ্ঞ শিক্ষকদের ব্যক্তিগত মেন্টরিং। এআই এবং মানুষের অভিজ্ঞতার এই ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবহার শিক্ষার্থীদের চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে অনেক বেশি প্রস্তুত করে তুলছে। গতানুগতিক মক ইন্টারভিউ থেকে বেরিয়ে এসে এআই-নির্ভর এই পদ্ধতিটি শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে একটি উদ্ভাবনী পরিবর্তন এনেছে।

শিল্প খাতের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ

বিমটেক-এর এই উৎকর্ষ কেবল ডিজিটাল ল্যাবরেটরিতেই সীমাবদ্ধ নেই। শ্রেণিকক্ষের তাত্ত্বিক জ্ঞানের সঙ্গে বাস্তব কর্পোরেট দুনিয়ার ফারাক কমানোর জন্য তারা একাধিক কৌশলগত পদক্ষেপ নিয়েছে। সিঙ্গাপুর ম্যানেজমেন্ট ইউনিভার্সিটির সঙ্গে তাদের একটি বিশেষ প্রোগ্রাম রয়েছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক পরিবেশে লাইভ প্রজেক্ট ও ক্রস-কালচারাল টিমের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা লাভ করে।

ইন্সুরেন্স শিক্ষাকে আরও মজবুত করতে সুইস রি-এর সঙ্গে এবং ভবিষ্যতের উপযোগী কর্মী তৈরি করতে ইউনিক্লো-এর সঙ্গে ইন্টার্নশিপ ও প্রশিক্ষণের চুক্তি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। লজিস্টিকস এবং সাপ্লাই চেইন ক্ষেত্রে হেক্সালগ টেকনোলজিসের সঙ্গে মিলে তৈরি করা হয়েছে একটি সেন্টার অব এক্সিলেন্স। এছাড়া ব্লুমবার্গ ফাইন্যান্সিয়াল মার্কেটস ল্যাব শিক্ষার্থীদের সরাসরি শিল্পের উপযোগী টুলস ব্যবহার করে হাতেকলমে শেখার সুযোগ দিচ্ছে।

শিক্ষার্থীদের বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি আরও প্রসারিত করতে প্রতিষ্ঠানটি নিয়মিত বড় মাপের অ্যাকাডেমিক ও কর্পোরেট অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। আইআইএম এবং আইআইটি-এর মতো দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে এক ছাতার নিচে আনতে আয়োজিত হয় ‘বিহান ২০২৬’ এবং ‘হার্মিস ডায়লগ ৬.০’। এর মধ্যে ‘ডিকোডিং টুমরো’ থিম নিয়ে আয়োজিত টেডএক্সবিমটেক ২০২৬ মানবকল্যাণ ও প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনার সুযোগ করে দেয়। পাশাপাশি ‘সিএক্সও টকস: কনভারসেশন উইথ জেন জি’-এর মাধ্যমে শীর্ষস্থানীয় কর্পোরেট লিডারদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার সুযোগ পায় শিক্ষার্থীরা। এই সমস্ত উদ্যোগ সম্মিলিতভাবে এনআইআরএফ র‍্যাঙ্কিংয়ের মূল স্তম্ভগুলোকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি গ্লোবাল বিজনেস এডুকেশনে বিমটেক-কে একটি আধুনিক বেঞ্চমার্কে পরিণত করছে।